মুক্তচিন্তা

করনা ও মৃত্যু ভীতি

শাহীন সিরাজ

জীবন নিয়ে কখনও এত ভীত ছিলাম না। গত 38 বছরে মৃত্যু নিয়ে কখনোই এত ভীতি মনের ভিতর কাজ করেনি। আশির দশকে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। এক দুরন্ত শৈশব ও কৈশোর জীবন পার করেছি মৃত্যুকে চরম উপেক্ষা করে। প্রচন্ড বৃষ্টি ও বিকট বজ্রপাতকে উপেক্ষা করে করে আম কুড়াতে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছি। প্রচণ্ড ঝড়ে যখন গাছপালা ভেঙে পড়ছে কিংবা কালবৈশাখীর প্রচন্ড বজ্রপাতে চারদিক হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ছে তখন তখনও দুর্দান্ত সাহসে সাইকেল করে স্কুল থেকে ফিরেছি। প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল হেঁটে গেয়েছি স্কুলের পথে কিংবা ইস্কুল থেকে বাড়ির পথে। 91 এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সময় এখনো মনে আছে সারারাত বসে বসে মজা করেছি। সেই ঝড়ে ঘর-দুয়ার উড়ে যেতে পারে হতে পারে, মৃত্যু অথচ তা ছিলনা ভাবনার ভিতরেও।

এখনো মনে আছে কি সেই প্রচন্ড ঝড়ো বজ্রপাত অথচ সব কিছুকে উপেক্ষা করে মাছ ধরতে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছি। গলা অবধি জোয়ারের পানি উপেক্ষা করে এক মাইল হেঁটে গিয়ে নৌকায় উঠেছি ইলিশ মাছ ধরা দেখবো বলে, অথচ যেকোনো সময় ডুবে মরে যেতে পারতাম। প্রবল স্রোতস্বিনি খাল পার হয়ে গিয়েছি 10-12 বছর বয়সে। স্রোতের কবলে পড়ে কতবার হাবুডুবু খেয়েছি, কিন্তু মরে যাওয়ার ভয় করিনি। গভীর পুকুরে ডুব দিয়েছি তলদেশ থেকে মাটি আনবো বলে কতবার মনে হচ্ছে এই বুঝি নিঃশ্বাস শেষ, দম ফুরিয়ে আটকা পড়ছি গভীরে জলে। কত গাছের মগডালে উঠে উঠেছি পাকা ফলটি খাবো বলে, ঢাল ভেঙ্গে মরে যাওয়ার ভয় করিনি। সারারাত বাড়ির পিছনে বসে ডাকাত পাহারা দিয়েছি, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে ভয় মনে আসেনি। চলন্ত বাস ট্রাকের পেছনে অনেকদূর দৌড়ে উঠে পড়েছি, এক্সিডেন্টের ভয় মাথায় আসেনি। বাড়ির পড়া শিখে আসিনি বলে প্রচন্ড মার খাওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও স্কুলে গিয়ে বেঞ্চে বসে থেকেছি তবুও ভয়ে কাঁপিনি। ধরা পড়ে মার খাওয়ার নিশ্চিত ও সম্ভাবনা জেনেও ঢুকে পড়েছি পাশের বাড়ির ফল খেতে। কি করিনি, শুধুমাত্র মৃত্যুকে ভয় পায়নি।

 প্রেমিকার বড় ভাইয়ের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাদদেশে। ভীতিহীন দুরন্ত শৈশব কৈশোর যার আজ তার আজ মৃত্যুকে বড় হয়। বাসা থেকে বের হতে ভয় হয়, কোন কিছুই ধরতে ভয় হয়,গলায় খুসখুস করলে ভয় হয়, একটু শরীর খারাপ করলে ভয় হয়, একটু পেট খারাপ করলে ভয় হয়, একটু মাথায় চিনচিন করলে ভয় হয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুভীতি নিয়ে জীবন যাপন করছি। কোথায় সে কৈশোরের দুরন্ত সাহসী ছেলে যে ক্রোধান্বিত ষাঁড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র এক হাত লম্বা লাঠি নিয়ে। আজ সে বড়ই অসহায় কারন সে মৃত্যুকে চিনতে শিখেছে। অজানা/ অদেখা শত্রুর ভয়ে আজ সে বড় অসহায়। হে প্রভু তুমি রক্ষা করো। বুকে সৃষ্টি করে দাও দুরন্ত সাহস।। আজ আমি একা নই, রয়েছে আমার সন্তানেরা তাদের জন্য আজ বড় অসহায়। তাদের চোখের কোণে তাকালেই ফিরে পেতে ইচ্ছে করে সেই দুরন্ত সাহস আরো কিছু দিন বেঁচে থাকার তীব্র বাসনা।।

লেখক- সিনিয়র সহকারী জজ, চাঁদপুর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপিরাইট সুবর্ণবার্তা !!
Close
Close