প্রচ্ছদশিক্ষা ও সংস্কৃতি

জিপিএ ফাইভ ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা!

ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন

গতকাল এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কারো উল্লাস! কারো চাপা কষ্ট! বিষয়! গোল্ডেন জিপিএ! জিপিএ ফাইভ ! অভিনন্দন পাশ-ফেল সবাইকে! শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সাথে আমরাও আনন্দিত। যারা ফেল করেছে তাদের জন্য ব্যথিত।

শিক্ষার কিছু সমস্যা নিয়ে শুরু করি।আমাদের সময়ে শিক্ষার সমস্যা ছিলো যেমন ছাত্র সংখ্যা কম, তারা অনিয়মিত, ক্লাসে কথা বলা, পড়া মুখস্থ না করা ইত্যাদি। এগুলোই ছিল বড় সমস্যা!

আর আজ আমাদের স্কুলের বড় সমস্যা হচ্ছে বন্দুক, ছুরি, বিপজ্জনক স্তরের মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার মুখোমুখি শিক্ষার্থীরা। এ সমস্যা গুলোকে অনেকেই ছাত্রদের ব্যক্তিগত সমস্যা বলে চালিয়ে দিতে চান। তবে এগুলি কেবল আমাদের পৃথকভাবে শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থারই সমস্যা।

আমাদের কাছে এখন একাডেমিক বুদ্ধিমত্তার থেকে শিক্ষার্থীদের জিপিএ ফাইভ বড়। আমরা শিক্ষার্থীদের শিখাই শুধু কীভাবে জিপিএ ফাইভ পেতে হয়। পাশাপাশি সহানুভূতি, মূল্যবোধ‌, চরিত্র গঠন আমাদের শিক্ষায় প্রায় অনুপস্থিত! আসলে আর আমরা যদি এগুলো শিক্ষা দেই তাহলে আমাদের শিশুদের জিপিএ ফাইভ এর তুলনায় আরও বেশি সুখী দেখতে পাবো, তারা যোগ্য নেতারূপে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

আমার কাছে শিক্ষার অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন করা, পরিবর্তন হওয়া, ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিশেষ গুনের প্রকাশ করা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর অনন্য স্বতন্ত্র সম্ভাবনা বের করে আনা, যার মাধ্যমে তারা কীভাবে তাদের প্রতিবন্ধকতা, ঘাটতি ও জীবনের বিপর্যয়গুলির কাছে যেতে পারে এবং তা মোকাবেলা করতে পারে তা শিখবে। তাদেরকে অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ আশার বাহন হিসেবে গড়ে তুলবে।

এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কথা কী কল্পনা করা যায় যেখানে শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে তারা কীভাবে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে, যেখানে শিশুদের শেখানো হবে মানুষের শারীরিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্য নয় বরং মানুষের হৃদয়ের অন্তর্গত সৌন্দর্যই আসল।

এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কথা কি কল্পনা করতে পারি যেখানে আমাদের সন্তানদের কীভাবে বিলিওনিয়ার হওয়া যাবে তা শেখানোর পাশাপাশি, শেখানো হবে যে মানুষকে সহায়তা করা বিলিয়নিয়ার হওয়ার চেয়েও মূল্যবান, যেখানে শেখানো হবে স্টান্ডার্ড অফ লিভিং এর পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড অফ গিভিং, যেখানে বাচ্চাদের সফলতার মাত্রা মাপা হবে না শুধু জিপিএ ফাইভ এর মাধ্যমে বরং তারা আসলে বাস্তবে কতটুকু হ্যাপি ও পরিপূর্ণ, যেখানে তারা ব্যস্ত থাকবেন না তাদের নামের পাশে কতগুলো উপাধি ও ডিগ্রী আছে আর উপাধির ভারে নামটি কত বড় তার উপর!

কল্পনা করতে পারি কী এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার যেখানে শিক্ষার্থীদের বুদ্ধির বিকাশ হবে, তাদের ভবিষ্যতের পরিবর্তন করার দক্ষতা অর্জন শেখাবে, দেশ ও বিশ্বের নেতৃত্ব শেখানোর পাশাপাশি নিজের মনকে নেতৃত্ব দিতে শেখাবে।

পরিশেষে: এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কথা কী কল্পনা করা যায় যেখানে গুরুত্ব দেয়া হবে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার উপর দয়ার, সফলতার চেয়ে চরিত্রের ও অর্থের চেয়ে সততার!

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপিরাইট সুবর্ণবার্তা !!
Close
Close