প্রতিবন্ধী তাজউদ্দিনের সংগ্রামী জীবন

জি.এম. সিরাজ উদ দৌলা: প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে নোয়াখালী সুবর্ণচর উপজেলার ৭নং পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের মোঃ তাজউদ্দিন (২৭)। ধৈর্য্য আর মেধার গুণে সে আজ বি.বি.এসের ছাত্র। সমাজে সুস্থ সবল মানুষগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে ধৈর্য্য আর একাগ্রতা থাকলে মানুষের পক্ষে কোন কাজই অসম্ভব নয়। ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তাজউদ্দিনই প্রতিবন্ধী। যদিও সে জন্মের সময় সুস্থ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু গ্রামের পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় তাকে পরবর্তীতে প্রতিবন্ধীর শিকারে পরিণত হতে হয়েছে।

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ার ৩নং সুখচর ইউনিয়ন অজিউল্যাহ মেম্বার বাড়িতে জন্ম নেওয়া তাজউদ্দিনের শৈশব কাটে এখানেই। প্রথমে মা-বাবার হাত ধরেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি। লেখাপড়ার প্রতি ছেলের আগ্রহ দেখে পিতা শামছুদ্দিন সাহেবাণীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ বছর বয়সে ভর্তি করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় তাজউদ্দিন প্রচন্ড মেধাবীর অধিকারী ছিলো। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তাকে বারবার ঘিরে ধরে। পিছিয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। অসুস্থার কারণে কোন কোন সময় বার্ষিক পরীক্ষায় সে উপস্থিত হতে পারিনি। একই শ্রেণিতে আবারো তাকে পড়তে হয়। মনে ভীষণ কষ্ট পেলেও হাল ছাড়ার পাত্র সে নয়। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় সুবর্ণচরের ঐতিহ্যবাহি পূর্ব চরবাটা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এখানে শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণে তাজউদ্দিনের জীবন পাল্টাতে থাকে। আবারো সে পড়াশোনায় গভীর মনোনিবেশ করে। এ স্কুল থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন।

এ ব্যাপারে পূর্ব চরবাটা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ উদ্দিন বলেন, তাজউদ্দিন প্রতিবন্ধী হলেও আর দশজন প্রতিবন্ধীর মতো সে নয়। ঘরে বসে থেকে পরের উপর নির্ভরশীল হতে সে চায় না। তাঁর লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ। সে আগ্রহ থেকেই আজ সে এতটুকু পর্যায়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে স্কুলের সভাপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমান ছাত্র তাজউদ্দিনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।

পরবর্তীতে তাজউদ্দিন ভর্তি হয় সৈকত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে বর্তমানে সে সোনাপুর ডিগ্রি কলেজে বি.বি.এসে অধ্যয়নরত।

তাজউদ্দিনের এখন একটিই স্বপ্ন, সরকারি চাকরিতে যোগদান করা। কিন্তু সহমর্মিতা ও সহযোগিতা না পাওয়ায় তার  সরকারি চাকরি অধরায় থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া সে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেও মত প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে তাজউদ্দিন বলেন, আমি প্রতিবন্ধী হওয়ায় অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কম্পিউটার শেখার পরেও কোথাও চাকরি হচ্ছে না। অনেক জায়গায় দরখাস্ত পাঠিয়েছি কিন্তু ভাইবা বোর্ডে আমার অবস্থা দেখে কেউ প্রাইভেট চাকরিতে নিতে চাচ্ছে না। বৃদ্ধ পিতা-মাতার উপর আর কয়দিন চলবো। নিজেকে তো কিছু একটা করতে হবে। এখন চাকরি পেলে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারবো। নতুবা আমার মাস্টার্স করার স্বপ্নটাও ভেস্তে যাবে।

ছাত্রলীগ কর্মী তাজউদ্দিন স্থানীয় পর্যায়ে বেশ পরিচিত। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ সমর্থক তাজউদ্দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সাংসদ সদস্যের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন সরকারিভাবে সহযোগিতার জন্য। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে যেন তাঁর অধিকার এর দিকে সরকার যেনো খেয়াল রাখে।

এদিকে হাতিয়া বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ও হাতিয়া উপজেলা আ’লীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক কেফায়েত উল্যাহ বলেন, প্রতিবন্ধী তাজউদ্দিন একজন মেধাবী ভালো ছাত্র। অত্যন্ত পরিশ্রমী। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণেই মাঝে মাঝে সে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে পারেনা। তিনি আরো বলেন, তাজউদ্দিনের নানা মরহুম অজিউল্যাহ মিয়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের একজন সফল কর্মী হিসেবে স্বীকৃত। দলের যেকোন প্রয়োজনের তিনি এগিয়ে গেছেন। তাছাড়া তাজউদ্দিনের নানা ৩নং সুখচর হাতিয়া বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আর আজ তাজউদ্দিনকে সংগ্রামের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। বিষয়টি খুবই দুঃখের ও হতাশার। সুবর্ণচর ও হাতিয়ার বিত্তবানদের অনুরোধ করে কেফায়েত উল্যাহ বলেন, প্রতিবন্ধী তাজউদ্দিনকে সরকারি-বেসরকারিভাবে চাকরিতে যোগদানে সহযোগিতা করবেন আশা রাখি।

Updated: August 5, 2020 — 11:20 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *