বিয়ের আগে ও পরের সংস্কৃতি পাল্টে গেছে

কাজী নাজরিন: সুবর্ণচরে এক সময় বিয়ে করার আগে বরপক্ষ পাত্রী দেখতে যেতেন আর বর কিন্তু সরাসরি পাত্রী দেখতে যেতেন না।বরের পাত্রী দেখা হতো অন্যরকম ভাবে যাহা এখন শতভাগ বিলুপ্তির পথে। সাধারণত তখন মা খালা কিংবা বোন ভাবীদের কাজ ছিল পাত্রী দেখার কাজ। অনেক বিয়েতে পাত্র সরাসরি বলেই দিতেন যে, আমি দেখা লাগবে না আপনারা দেখলেই চলবে।অন্যদিকে কোন কোন রসিক পাত্র বলে দিত আমি পাত্রী দেখতে চাই।তখন দেখা হতো দূর হতে পাত্রীকে কেউ হেটে নিয়ে যাচ্ছে বা কেউ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এই ভাবে।আবার কেউ দেখতে যেতেন পুকুরের অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন আর পাত্রী এই পারে পুকুর ঘাটে চাল কিংবা কিছু ধোয়ার জন্য নিয়ে ঘাটে যেত।কেউ কেউ আবার রাতের বেলা বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে ও পাত্রী দেখার কাজ সেরে ফেলতেন।এই অবস্থায় পাত্রী দেখতে গেলে পাত্রকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হতো!! যেমন, বাড়ির পালিত কুকুরের তাড়া ও খেতে হতো! অনেকেই আবার কুকুরের জন্য বিস্কুট ও নিয়ে যেত যাতে কুকুরের সামনে বিস্কুট ফেলে দিলে কুকুর তাড়া করা থেকে বিরত থাকতো। এক দাদার মুখে শুনেছিলাম উনি নাকি পাত্রী দেখার জন্য উনার বন্ধু সহ পাত্রীদের পুকুর পাড়ের আম গাছের উপর উঠে বসেছিলেন। আর পাত্রী পুকুর ঘাটে আসামাত্রই দুইজনে হেসে দিলেন। পরে পাত্রী পক্ষের তাড়ানি খেয়ে ছুটে পালিয়ে এসেছিলেন! এইভাবে ওই পাত্রীকেই পরে বিয়ে করেছিলেন। এইরকম অসংখ্য চোরাই পদ্ধতিতে পাত্রপক্ষ পাত্রী দেখার কাজ সেরে ফেলতেন।কারণ তখনকার সময় মহিলা ছাড়া কোন পুরুষের সামনে কেউ কারো মেয়েকে দেখাতেন না।মহিলারা ও বিভিন্ন চল চাতুরী করে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পাত্রী দেখে আসতেন ভাই কিংবা ছেলের জন্য।কেউ কেউ পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে পানি খাওয়ার অজুহাত করে মেয়ে দেখে আসতেন।তখনকার মায়েরা মানে যাদের মেয়ে আছে তারা ঠিকই বুঝতে পারতেন আর তাই নাস্তা পানি কিংবা খাবারের ও ব্যবস্থা করে ফেলতেন।এই ছিল ষাট কিংবা সত্তরের দশকের পাত্রী দেখার পদ্ধতি।
আসুন এবার বিয়ের পরের অবস্থা বিবেচনা করে দেখি।
বিয়ের পর বরের মুখে থেকে রুমাল যেন সরতোই না।বর লজ্জানত অবস্থায় শশুর বাড়িতে বেড়াতে আসতেন।আর শশুর বাড়িতে নতুন বউয়ের থাকতো লম্বা এক ঘোমটা। আর কেউ নতুন বউ দেখতে আসলে অন্য কেউ ঘোমটার কাপড় তুলে নতুন বউদের মুখখানা দেখাতেন। অপরদিকে লজ্জানত নতুন বউ লজ্জায় চোখ বন্ধ করে দিতেন।বিয়ের পর পাত্রপক্ষ এবং পাত্রীপক্ষের লোকজন নতুন বউ এবং বরের জন্য চালাতেন অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা। উঠোনের মাঝে ছোট পুকুর কেটে শিং মাছ ধরার মতো কঠিন পরীক্ষার
সম্মুখীন ও হতে হতো নতুন বউকে!! আর বিয়ের আড়াই দিন পর হিরানির আয়োজন হতো জমকালো ভাবে।তাতে একপক্ষ অন্যপক্ষের গায়ে করতেন রঙ মাখামাখি। এরপর থাকতো আবার বেয়াই আর বেয়াইনদের জন্য অনুষ্ঠান যাকে বলা হতো বেয়াই খানা।নতুন বরের বাড়িতে পাঠানো হত হরেকরকমের কারুকাজ করা সুনিপুণ হাতের অনেক পিঠা। পিঠা তে লিখা হতো বর কনের নাম।ঢালাতে করে খবর কাগজ মুড়িয়ে কনেপক্ষ পিঠা পাঠাতেন বর পক্ষের বাড়িতে।পাত্রপক্ষ ওইসব পিঠা গ্রামের মানে সমাজের সবার মাঝে বন্টন করতেন।পাত্রীপক্ষের ঢালাগুলো খালি না পাঠিয়ে পাত্রপক্ষ আবার সবাইকে নিয়ে পিঠা বানিয়ে বউদের বাড়িতে পাঠাতেন।পিঠা দেয়া হতো ঢালা এবং বড় বড় বোলে করে অনেক গুলো। যাহা পাত্রীপক্ষ ও আবার তাদের সমাজের সবার মাঝে বন্টন করতেন।এখন দিনে দিনে এইসব প্রথা একদম পাল্টে যাচ্ছে। এখন সবাই কষ্ট করে পিঠা বানানোর ভয়ে পিঠা বানানোর শুকনো উপকরণ গুলো আর দোকান থেকে মিষ্টি ও ফল কিনে নিয়ে যায়।দিনে দিনে মানুষ অলস হতে চলেছে, আর সেইসাথে সমাজের বন্ধনটা ও কমে যাচ্ছে।এখন আর আগের মতো সবার মাঝে সেই আন্তরিকতা নেই।হারিয়ে যাচ্ছে আগের সব প্রথা বা ঐতিহ্য!!
বি:দ্র: আগেকার দিনের বিয়ের আগের এবং পরের আরো নতুন কোন অভিজ্ঞতা কারো জানা থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন প্লিজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *