মুক্তচিন্তা

ভার্চুয়াল ভাইরাস ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

মোহাম্মদ নিজাম উদ্দীন

এখন থেকে প্রায় তিন যুগ আগের কথা। এ অঞ্চল থেকে যারা নিজের এবং পরিবারের সচ্ছলতার জন্যে কর্মসংস্থানের খোঁজে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন, তাদের অধিকাংশেরই স্ত্রীগণ শিক্ষিত ছিলেন না। ফলে প্রিয় স্বামীর সাথে মনের ভাব প্রকাশ বা তাদের অবস্থা, অবস্থান জানানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বাড়ির পার্শ্ববর্তী কোনো ছেলে বা মেয়ে যদি প্রাইমারি পাশ বা তার উপরে পড়ুয়া অবস্থায় থেকে থাকে তো তাদের কাছে গিয়ে, একটা চিঠি লিখে দেওয়ার জন্যে ধর্না দিত। যার চিঠি, তার মনের কথা কে নিজের আয়ত্ত করে, লেখক তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, চিঠি লেখা শেষ করতো। গৃহবধু চিঠি খানা হাতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে, নিকটজনের কাউকে দিয়ে খামে ভরে তা ডাক বিভাগে পাঠাত। কিন্তু আফসোস এই চিঠিতে কি লেখা হয়েছে, লেখক যা পড়ে শুনিয়েছে, তা ছাড়া সে কিছুই জানতো না ! যাইহোক স্ত্রীর ভালো-মন্দের কথা এ চিঠির মাধ্যমে স্বামী যখন জানতো, ততদিনে সময়ের ব্যবধান হয়ে যেত কখনো কখনো এক মাস বা তারও উপরে। আর এখন তা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, টুঁইটার, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতি মিনিটে মিনিটে খবর দিচ্ছে এবং নিচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে বর্তমান মানব সভ্যতা।

একবার মনে পড়ে, আমি তখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। বাড়ির কাছের জনৈক মহিলা এসেছিলেন, তাকে একখানা পত্র লিখে দিতে। পত্রের ভাষা সম্পর্কে লেখক এবং কথক কেউ পারদর্শী ছিলনা। অগত্যা হরলাল রায়ের ব্যাকরণ বই খুলে, ভূমিকা ও উপসংহার সম্পর্কে লেখকের কিছুটা ধারণা হলো বটে, কিন্তু গর্ভাঙ্কে কি লেখা হবে, তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা! মহিলাকে তো আর নিরাশ করা যায়না, তাই অবশেষে এভাবে পত্র লেখা শুরু হলো-
” প্রিয়তমেষূ

পত্রের শুরুতে আমার শতকোটি সালাম জানিবেন। আপনার বন্ধু মহলেও সেইরূপ জানাইবেন।

………………….ইতি-
আপনার প্রিয়তমা স্ত্রী ‘খ’

লেখা শেষ হলে, পড়ে তা শোনানো হয়েছে। শতকোটি সালাম লিখেছি বটে কিন্তু ভালোবাসা লেখা হয়নি ! গর্ভাঙ্কে ‘তারা ভালো আছে, টাকা দরকার’ লিখা হয়েছে। আনন্দ চিত্তে পকেটে দশটা টাকা দিয়ে, চিঠি খানা নিয়ে মহিলাটি অনেকটা দৌড়ে চলে গেলেন। পরবর্তীতে খবর পেলাম, ‘মিডিলিস্ট’ থেকে এ চিঠির উত্তর এসেছে দুমাস পর।

নতুন প্রজন্মের কাছে এসকল বিষয় গল্প এবং হাস্যকর! কারণ, খবর আদান-প্রদানে এখন দুমাস তো প্রশ্নই উঠেনা, দু মিনিটও দেরি হয় না। জুকারবার্গ তার মেধার প্রয়োগ দেখিয়ে সময় এবং দূরত্ব কে করেছেন,সঙ্কীর্ণ ও নিকটবর্তী। শুধু কি তাই ? হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি’র মাধ্যমে অতি আপন জনকে করেছে নিকট থেকে অতি নিকটে। স্বজনেরা তেপান্তরে থাকলেও মনে হয় পাশেই রয়েছে। দূরে থাকার বেদনা, খারাপ লাগার হতাশা, এসকল কোন কিছুই এখন আর কাউকে দুঃখ দেয় না। দৈনিক খবরের জন্য খবরের পাতা উল্টাতে হয় না, অপেক্ষা করতে হয় না হকার কতক্ষণ সময়ে খবরের কাগজ দিয়ে যাবে। ফেসবুকে নিত্য দিন ও সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের হৃদয়পট ও মানস চক্ষে।
কখন-কোথায় কী হচ্ছে ? ভালো কি মন্দ, উচিত কি অনুচিত, শিক্ষা-বিনোদন,খেলা-ধুলা সহ যাবতীয় ঘটনা প্রবাহের আপডেট, ক্ষণে-ক্ষণে ভেসে উঠেছে আইফোন-অ্যান্ড্রয়েড নামক যন্ত্রটির বুকে। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এসকল উপাদান গুলো, মানুষের কল্যাণ সাধন করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

আসল সত্য হলো- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মহা-কল্যাণ ও মহা-সাফল্যের পরেও কিছু মহা-ক্ষতিকর দিক রয়েছে, যা পর্বত সদৃশ সফলতার সূচককে অনেকাংশে অবদমিত করে ফেলেছে ! শিষ্টাচার, সময় ও নিয়মানুবর্তিতা বহুলাংশে কেড়ে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ! তরুণ প্রজন্ম তো বটেই আবাল বৃদ্ধারাও হয়ে গেছে যান্ত্রিক! যন্ত্র তাদেরকে আষ্টে-পিষ্টে এমনভাবে বেঁধেছে যে, এ থেকে এখন বের হওয়া দায়। কোন সু-লেখকের বই পড়া কিংবা পারিবারিক কাজের সময় বের করা যায় না, কিন্তু ফেসবুকে দিন-রাত কেটে যায় তাতে কোন সমস্যা নেই ! জনৈক মেধাবী ছাত্রের গল্প শুনেছিলাম, এরকম যে- তার পিতা তাকে দেখতে গিয়েছিলেন ছাত্রাবাসে। বইয়ের প্রতি তার মনযোগ এত বেশি ছিল যে, ঘন্টাখানেক খোলা দরজায় পিতা দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু সেদিকে তিনি খেয়ালই করেননি। এখনকার সময় অবশ্য ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে থাকে ! এখন মরার কোকিল ঘুম ভাঙ্গায় না, ফেসবুকই সারারাত জাগ্রত রাখে অধিকাংশ তরুণ প্রজন্মকে। যথাসময়ে এ ভাইরাসের প্রতিষেধক যদি প্রয়োগ করা না হয়, অচিরেই একটা শ্রেণি হারাবে তাদের চোখ, কান এবং শরীর। বিজ্ঞানের কল্যাণময় আবিষ্কার কে যদি জনহিতকর কাজে লাগিয়ে, এর সু-ব্যবহার, সু-ব্যবস্থাপনা এবং সু-প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধান করা যায়, তবেই তা সকলের জন্য মঙ্গল।

আসুন আমরা এই ‘ভার্চুয়াল ভাইরাস’ বা ডিজিটাল কোকেন থেকে মুক্ত থাকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের নেশাকে বর্জন করি, এর পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে যান্ত্রিক নয়, মানবিক হই। বই বিমুখ নয় বরং বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মকে লেখা-পড়ায় অধিক সময় ব্যয় করে একজন আদর্শ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করি। বিজ্ঞানের সু কৃতি গুলো প্রয়োগের মাধ্যমে আধুনিক কল্যাণকর দেশ গঠনে সকলেই ভূমিকা রাখবো, এটাই হোক আমাদের প্রকৃত সাধনা।

লেখক- প্রভাষক, চরবাটা ইসমাইলিয়া আলিম মাদ্রাসা, সুবর্ণচর, নোয়াখালী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপিরাইট সুবর্ণবার্তা !!
Close
Close