মুক্তচিন্তা

সরল স্বীকারোক্তি ও সমাজ চিন্তা

মো. নিজাম উদ্দিন

গ্রামীণ পরিবেশে মানুষ, ধরতে গেলে নদী কূলে বসতি। বাড়ি থেকে নদীর দূরত্ব খুব একটা বেশি ছিলোনা। ছোটবেলায় টিনের ঘরের উপরে তুলিতে উঠে,পালতোলা ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা দেখা যেত। ভরা কাটালে জোয়ারের পানি বাড়ির উঠান পর্যন্ত ভিজিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাওয়া যায়। পূর্ব পুরুষ গণ বর্তমান কোম্পানিগঞ্জ (বামনি) থেকে চর বধু হয়ে চরবাটায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী প্রজন্ম (অামাদের) বাইরে যাওয়ার সুযোগ কই। মেঘনা বিধৌত নোয়াখালীর চরেই বসতি, চরেই অামাদের ঠিকানা।

চাচা এই নদী কূল থেকে আরেক নদী (বর্তমান ওয়াবদা + জব্বার) পাড়ি দিয়ে বেগমগঞ্জ পাইলট স্কুলে লেখাপড়া করতেন। সেখান থেকে এসএসসি ও চৌমুহনী এস এ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চাকরির জন্য রেলওয়ে এবং এয়ারফোর্সে পরীক্ষা দেন। দুই জায়গায় জয়েন লেটার পেলে, তিনি এয়ারফোর্সকে বেছে নিলেন। চাকুরি অবস্থায় গ্রাজুয়েশন ডিগ্রিও অর্জন করেন। অবশ্য বাবার পড়ালেখা বেশি ছিল না, নিজে না পড়ে ছোট ভাইকে পড়ানোর দিকে মনোযোগ বেশি ছিল বলে জানা যায়। চাচার ডায়েরি থেকে জানতে পারলাম, দাদার বাবা ও তাঁর বাবা পবিত্র হজ্ব ব্রত পালন করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় ওনারা তখনকার সময়েও মোটামুটি ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারি ছিলেন। কিন্তু আমার মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, কিছুটা বুঝদার থাকার পরে ওনারা কেন যে দু’দুইবার ভাঙ্গনের কবলে পড়েও নদীকূলে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলেন, তা আমার বুঝে আসেনা।

ছোট বেলায় বাই-সাইকেল শেখার ঝোঁক ছিল প্রবল। স্কুল পালিয়ে সাইকেল নিয়ে কখনো কখনো নদীকূলে খোলা সমতল মাঠে (ভক্কার টেক), জন কোলাহল মুক্ত পরিবেশে, সাইকেল চালানো মোটামুটি শেখা হয়েছে। সহযোগী হিসেবে খলিল, আতিক, এনায়েত এরাও ছিলো। চালানো এবং সাইকেলে উঠা কিছুটা শেখা হয়েছে বটে, কিন্তু নামাটা পুরোপুরি শেখা হয়নি, এরকম সময়ে সাইকেল জমা দেওয়ার জন্য রাস্তা দিয়ে বাজার অভিমুখে রওনা হলাম। ইত্যবসরে খড়ের বিশাল বোঝা নিয়ে বিপরীত দিক থেকে এক লোক আসছিল। বেল বাজাবো, ব্রেক ধরবো, নাকি নেমে পড়বো এ চিন্তা করতে করতে সাইকেলসহ লোকটার গায়ের সাথে গিয়ে লাগলো ধাক্কা। লোকটার বোঝা গিয়ে পড়লো রাস্তার পাশে খালে। আমি এবং আমার বাহন ভাড়া সাইকেলটি সহ একই জায়গায়। বাবাকে জনানো তো দোষের। অগত্যা ব্যথাও পেলাম, ক্ষমাও চাইলাম, সাইকেলের পার্টস খোয়া যাওয়ায় ভাড়াও সেদিন বেশি গুনতে হয়েছিল।

ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলাম জানিনা, তবে ক্লাসে অবস্থান প্রথম বা দ্বিতীয়ের মধ্যে ছিলো। বিড়ি-সিগারেট-পান ইত্যাদি নেশা জাতীয় কোনো কিছুর সাথে জড়িত ছিলামনা,এখনও নাই। বরং মদ জুয়া সহ সামাজিক অবক্ষয় জনিত কাজ গুলো তখন থেকে ঘৃণা করতাম, এখনও করি। ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাসে রুমমেট প্রচন্ড ধুমপায়ী ছিলো কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও আমাকে তা স্পর্শ করেনি। পর দুঃখে কাতর, অন্যায়কে অন্যায় বলা, দু:খী জনের দুঃখ নিবারণে কাজ করা, সর্বোপরি উগ্রতার বিপরীতে নরম মানসিকতা লালন করাই ছিলো আমার একমাত্র ব্রত।

মদ-জুয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি এবং নির্যাতিত এবং বঞ্চিতদের কল্যাণে কাজ করার জন্যে ছাত্র জীবনে (১৯৯১-৯২) গড়ে তুলেছিলাম- ”Student Association For Social Development(SASD)” বা
সমাজ কল্যাণ ছাত্র সংস্থা। কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে ছিলাম আমি। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিলেন, বর্তমান বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন গাজি। সেখান থেকে গাজির রাজনৈতিক উত্থান। আমি ছিলাম রাজনীতি বিমুখ।

নিজেকে অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করতাম। সংগঠনটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শাখা কমিটির সভাপতি গণ ছিলেন যথাক্রমেঃ-
# চরবাটা আরজি উচ্চ বিদ্যালয়- মো: ফখরুল ইসলাম টিটু,বর্তমানে CA ঢাকা।
# চরবাটা খাসের হাট উচ্চ বিদ্যালয় – মো: নুর নবী, বর্তমানে পুলিশ ইন্সপেক্টার চট্টগ্রাম।
# দুলাল মিয়ার হাট আজিজিয়া দা:মা সভাপতি মো: কামাল উদ্দিন, বর্তমানে বিভাগীয় চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ছমির হাটের ২জন সুনাম ধন্য মেম্বারের আস্তানায় মদের সন্ধ্যান পেলে, সংগঠনের ছাত্ররা তা রাস্তায় ঢেলে দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টা এত বেশি তিক্ততায় গিয়ে পৌঁছে যে, দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও মারা মারি পর্যন্ত গড়ায়। তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে গেলে, তৎকালীন চরজব্বার ফাড়ি থানার কর্মকর্তা আব্দুল খালেক সাহেব বলেছিলেন,”ছাত্ররা একটা সামাজিক ভালো কাজ করেছে, আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে পারবো না”। পরে বিষয়টি ছমির হাট বসে সমাধান করা হয়। ঐ সময় এ সকল প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বৃহত্তর চরবাটায় মদ-জুয়ার বিরুদ্ধে একযোগে মিছিল করেছিল। এটা ছিল একটা অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম, তবুও আমাদের কে তৎকালীন এমপি মহোদয় এবং তখনকার চরবাটার চেয়ারম্যান মহোদয় ও চরজব্বার ফাড়ি থানার কর্মকর্তা, সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন। পরবর্তিতে উচ্চ শিক্ষার্থে এলাকার বাইরে চলে গেলে, সংগঠনটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।

প্রায় ১০ বছর পর এলাকায় এসে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিয়ে গঠন করি- “আদর্শ সমাজ উন্নয়ন সংস্থা”। উদ্দেশ্য সুবিধা বঞ্চিত হত দরিদ্রদের নূন্যতম সহযোগিতা প্রদান। নিজেদের সঞ্চয়ের পাশাপাশি কল্যাণ তহবিল গঠন করে, দশ বছর অপরিমিত সেবা প্রদান করা হয়। অতঃপর এলাকার যুব সমাজকে নিয়ে একই উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়- “পূর্বচরবাটা মানব কল্যাণ সংস্থা” যা এখনো চলমান। এছাড়া “উপকূল উন্নয়ন সংস্থা”র সাধারণ সম্পাদক ও “লাইয়ন্স ক্লাব অব নোয়াখালি”র সদস্য, “প্রফেসর ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (PDF)”র উপদেষ্টা মণ্ডলির সদস্য, এবং “নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)” নোয়াখালি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেবা ব্রতী কাজে শ্রম-ঘাম-অর্থ ব্যায়ে নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করি।

রাজনীতি বিমুখতা প্রথমে কাজ করলেও পরিণত বয়সে এসে রাজনীতির ছোঁয়া থেকে দূরে থাকা যায় নি। পদ-পদবিতে যাওয়ার ইচ্ছা তখনো ছিলনা, এখনো নাই। এক্ষেত্রে যাঁর আন্তরিকতা ও একান্ত ইচ্ছা আমাকে কাছে টেনেছে, তিনি হলেন- আমার পূজনীয়, শ্রদ্ধেয়, সমাজ-রাজনীতি ও শিক্ষাগুরু, নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, অধ্যক্ষ এ এইচএম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম। ‘৯৬ এমপি ভোটে তাঁর এবং পরবর্তীতে উনি ও ওনার সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন কালীন সময়ে সামর্থ্যানুযায়ী নিজেকে উজাড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বিনিময়ে সরকার বা দল থেকে কোনো রকম সুবিধা নিতে কখনো চেষ্টা করিনি, ইচ্ছাও নাই। তবে আমার সামাজিক মান-মর্যাদা, পরিচিতি, যতটুকু আছে তার কৃতিত্ব আল্লাহর কৃপা তো রয়েছেই, মানুষ হিসেবে আমার এই শ্রদ্ধেয় গুরুর অবদান অনস্বীকার্য। আমার চলার এই স্থিমিত মন্থর ধারাকে গতি এনে দিয়েছিলেন তিনি। সুতরাং তার জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর কালেও ওনার স্তুতি স্বীকার করা, আমার কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। একবার কলেজে নিয়োগ পরীক্ষায় যোগদান করিনি বিধায়, তিনি আমার স্বার্থে আমার উপর চটে ছিলেন। এতদ ভিন্ন সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমার উপর কখনো রুষ্ট হয়ে কথা বলেছেন কিনা মনে পড়ে না। তিনি আমাকে স্নেহ ও বিশ্বাস করতেন। আর আমি তা রাখার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার এই শ্রদ্ধেয় গুরুর দীর্ঘায়ু দান করেন।

আমারে অনুজদের প্রতি পরামর্শঃ- অন্যায় করা ও অন্যায়ের সমর্থন থেকে বিরত থাকবে। নেশা জাতীয় কোন কিছুর ধারে কাছেও যাবে না। তোমার অবস্থান থেকে তোমার আত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশীর উপকার করার চেষ্টা করবে। তোমার থেকে যাতে কেউ কষ্ট না পায়, সে বিষয়ে অধিক সজাগ থাকবে। কখনো পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না। বড়দের কে শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করবে। এ সকল কর্মকান্ডে তোমার মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তি, আত্মমর্যাদা বোধ, কাজ করবে এবং সব সময় নিজেকে হালকা ও নির্দোষ ভাবা সহ সামাজিক মান-মর্যাদা বাড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বড় নেতা হয়ে সমাজ সেবা করা যায়, এটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। এর বাইরে থেকেও সমাজ সেবা করা যায়, শুধু মনস্থির করুন অতঃপর কাজে নেমে পড়ুন। দেখবেন সফলতা আপনার দ্বার প্রান্তে। আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝা এবং মানার সক্ষমতা দান করুন।

লেখক: প্রভাষক, চরবাটা ইসমইলিয়া আলিম মাদ্রসা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপিরাইট সুবর্ণবার্তা !!
Close
Close