সৃজনশীলতা কাকে বলবো..?

কাজী নাজরিনঃ

আজকাল স্কুল গুলোতে সৃজনশীলতার নামে বাচ্চাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে হরেক রকমের সৃজনশীল গাইড, হরেক রকম প্রকাশনীর।আর বাচ্চাদের চাপ দেয়া হচ্ছে এই এই গাইড গুলো বাধ্যতামূলক কিনতেই হবে!!এই সৃজনশীল গাইড কেনা থেকে রেহাই পাচ্ছেনা প্রাথমিক শাখার শিক্ষার্থীরা ও! এটি বিশেষ করে কেজি স্কুল আর প্রাইভেট স্কুলে বাধ্যতামূলক!!!!

এই পরিপ্রেক্ষিতে নিজের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি, আমি তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ১ম সাময়িক পরীক্ষার প্রথম দিন বাংলা পরীক্ষা শুরু হলো। পরীক্ষার হলে গিয়ে হাতে প্রশ্ন পাওয়ার পর দেখলাম তিনটা রচনা আসছে, আর সেগুলো হলো, পাট,গরু,আমাদের বিদ্যালয়।এরমধ্যে আমি ভালো করে মুখস্থ করে গিয়েছিলাম পাট।আমি লিখতে যাবো আমার রচনা ওই মুহূর্তে স্যার এসে আমার পাশের অনেক জনকে বলতেছেন, কিরে বসে আছিস কেন?তাড়াতাড়ি লিখে শেষ কর।তখন একজন জবাব দিল স্যার রচনা পারিনা, ভুলে গেছি।

এরপর স্যার সুন্দর করে সবার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, যাদের রচনা লিখতে কষ্ট হচ্ছে তারা সবাই ওই যে মাঠে বেঁধে রাখা আছে সেই গরুটা দেখে গরুর রচনা লিখা শুরু করে দাও।সবাই দেখি এবার কলম চালানো শুরু করে দিল।অনেকেই বলতে লাগলো, স্যার তো ক্লাসে আমাদেরকে এইভাবেই লিখতে বলেছিলেন,মূখস্থ না করে নিজের দেখা এবং জানার অভিজ্ঞতা থেকে সব সময় রচনা লিখার জন্য।আমার আরেক সহপাঠী তখন বলতে লাগলো, আমি এখন কিন্তু আমাদের বিদ্যালয় রচনা ও সুন্দর করে লিখতে পারবো। তখন স্যার বলেছিলেন হ্যাঁ লিখতে পারো, আমাদের বিদ্যালয়ে কি কি আছে সব বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে লিখা শুরু করে দাও। মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে নিজে থেকে লিখা অনেক ভালো।

যাইহোক এবার আমি ও আমার মুখস্থ করা পাট রচনা না লিখে গরুর রচনা লিখা শুরু দিলাম।অনেক মজা করে এক পৃষ্ঠা লিখে শেষ করলাম। আর লিখার মধ্যে পুরো নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর চোখের দেখা গরুর বাস্তব সব কথা।বুঝার সুবিধার্থে কয়েক লাইন তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

,,,,,,,,,,,,,, গরু

আমাদের বাড়িতে আমাদের অনেক গুলো গরু আছে।আর আমাদের গরু গুলো বাড়িতে থাকেনা, আমাদের খামার বাড়িতে থাকে।আর খামার বাড়ির পাশে বিরাট একটা ফরেস্ট বাগান আছে ওই বাগান হতে গরু ঘাষ ও লতা পাতা খায়।গরু অনেক ধরনের হয়ে থাকে যেমন লাল,কালো, সাদা ও মিশ্রিত রঙের। গরু হতে আমরা দুধ পেয়ে থাকি যাহা আমরা প্রতিদিন খেয়ে থাকি।গরুর মাংস ও আমরা খেয়ে থাকি।গরুর দুটো শিং,দুটো চোখ,দুটো কান, চারটি পা ও একটা লম্বা লেজ আছে। লেজের আগায় এক গোঁছা চুল আছে,,,,,,,,।এইসব বিবরণ কিন্তু মাঠের গরু দেখেই লিখে দিয়েছিলাম।

আমার মতো সবাই এইরকম করে পরীক্ষায় রচনা কিংবা প্রশের উত্তর লিখে চলে আসতাম।পরীক্ষার পর দেখা যেত ওই রচনা তে দশ নাম্বারে আট অথবা নয় নাম্বার দিয়ে দিতেন স্যার।আর আমাদের কোন গাইড ছিলো না।আম্মা নিজের মতো করে সাজিয়ে পড়াতেন।

আমাদের ওইসব ছাত্রদের মধ্য হতে অনেকেই দেশের অনেক অনেক উচ্চ পদে স্থান করে নিয়েছেন। আর পড়ার জন্য বেশি চাপাচাপি ও করা হয়নি তখন।হেসে খেলে মনের আনন্দে পড়ালিখা শিখেছে স্যারদের মুখে মুখে।এই ছিলো প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতি। এইভাবে অভ্যস্ত হতে হতে সবার মাঝে এক ধরনের সৃজনশীলতা কাজ করতো।সবাই নিজেদের থেকে লিখার অভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হতো। আমার কাছে মনে হয় সেই পদ্ধতি অনুসরণ করলেই আসল সৃজনশীলতা অর্জন করা সম্ভব।

এবার আসুন বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে, ছোট ছোট কচি সোনামণিদের হাতে তুলে দেয়া দেয়া হচ্ছে হরেক রকমের বই আর গাইড!কেজি কিংবা ওয়ানের বাচ্চাদের দেয়া হচ্ছে বিশাল এক সাজেশান।যাতে আছে ইংরেজি, বাংলা,সমাজ কম্পিউটার,গণিত, সাধারণ জ্ঞান,,,,,,,,, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর হুবহু গাইডের মতো না লিখলে মিলছে না কোন নাম্বার।আমার তৃতীয় শ্রেণীতে লিখা গরুর রচনা এখনকার তৃতীয় শ্রেণির বাচ্চা লিখলে নাম্বার পাবে ডাবল জিরো মানে দুইটা গোল আন্ডা।তাদেরকে তোতা পাখির মতো পড়ার পর পড়া গিলানো হচ্ছে!সাথে মাথার সব মগজ উলোট পালোট করা হচ্ছে।

এবার দেখি উপরের সারিতে আসার পালা,বিসিএস, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় জরিপ করলে দেখতে পাবেন তোতা পাখির চেয়ে সেই গ্রামের প্রাইমারী স্কুল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি।ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সরকারের উচ্চ পদে দেখতে পাবেন তোতা পাখির সংখ্যা খুবই কম।প্রাইভেট গুলো তে কিন্তু আবার জায়গা করে নেয় সকল তোতা পাখি দল।তোতা পাখিদের কিন্তু দোষ নয় তাদেরকে বাধ্য করে, চাপ প্রয়োগ করে মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে সৃজনশীল নামক বল প্রয়োগ কারী শিক্ষা পদ্ধতি!!

তাই হাজারো গাইড নিয়ে সৃজনশীলতার নামে মগজ নষ্ট কারী এই পদ্ধতি আমার খুবই অপছন্দের। আমার কাছে সেই পুরনো পদ্ধতি অনুসরণই হলো প্রকৃতপক্ষে সৃজনশীলতা।যাহা পাঠ্যবই থেকেই পড়ানো সম্ভব কিছু পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *